একান্ত সাক্ষাৎকারে নতুন যে বার্তা দিলেন রিজভী

রুহুল কবির রিজভী; সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির দফতর সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। চলমান রাজনীতির বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। আলোচনায় গুরুত্ব পায় দলটির চেয়ারপারসন কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা, নির্বাচনসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সায়েম সাবু। দুই পর্বের শেষটি থাকছে আজ। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে তারেক রহমান কখন দেশে ফিরবেন

জাগো নিউজ : খালেদা জিয়া জেলে। তারেক রহমান দেশের বাইরে। নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা কাজ করছে কিনা?

রুহুল কবির রিজভী : না, নেতাকর্মীদের মাঝে কোনো হতাশা আছে বলে মনে করি না। বরং তাদের মাঝে প্রতিশোধ, প্রতিরোধের চেতনা কাজ করছে। নেতাকর্মীরা আজ উজ্জীবিত, ঐক্যবদ্ধ।

তারেক রহমান বছরের পর বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সরকার তার ঘৃণ্য উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য নানা অপকৌশল করে যাচ্ছে। জাগো নিউজ : তারেক রহমান দেশের বাইরে। এ ক্ষেত্রে তার ইচ্ছাকে অধিক গুরুত্ব দেবেন, নাকি সরকারের রোষানলকে?

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সরকার কী করতে পারে, তা আপনি নিজেও উপলব্ধি করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। নির্বাসনে থেকেই নেতৃত্ব দিতে হয়েছে

রুহুল কবির রিজভী : অবশ্যই সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে বাইরে থাকতে হচ্ছে। বিচারক তাকে খালাস দিয়েছেন। অথচ সেই বিচারককে পালিয়ে দেশের বাইরে যেতে হয়। উচ্চ আদালতে নিয়ে ফের সাজা দেয়া হয়। এগুলো তো প্রতিহিংসার রাজনীতি। পরিকল্পিতভাবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা এবং সাজা দেয়া হচ্ছে।

জাগো নিউজ : পলাতক দেখিয়ে তারেক রহমানের রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন আদালত। আপনি কি মনে করেন, তারেক রহমান দেশে থাকলে দলের মধ্যকার সংকট নিরসনে সহায়ক হতেন?

রুহুল কবির রিজভী : সরকার যে ধরনের মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তাতে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যেকেনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

জাগো নিউজ : কী ধরনের আশঙ্কা করছেন?

বিএনপি এখন পারছে না, ভালো কথা। তাহলে অন্যরা আসুক। আমরা স্বাগত জানাবো। বাম-ডানের অবস্থান কোথায়? তাদের কার্যক্রম কী? সব নির্যাতন তো আমাদেরই সইতে হচ্ছে

রুহুল কবির রিজভী : সে আশঙ্কার কথা এ মুহূর্তে আপনাকে বলবো না। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সরকার কী করতে পারে, তা আপনি নিজেও উপলব্ধি করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে, নির্বাসনে থেকেই নেতৃত্ব দিতে হয়েছে।

জাগো নিউজ : প্রায় এক যুগ হতে চললো তারেক রহমানের কথিত নির্বাসন বা পালিয়ে থাকা। কী ফল আসছে এ নির্বাসনের জীবন থেকে?

রুহুল কবির রিজভী : সরকার যেরকম আগ্রাসী, তাতে সরকারের ঘৃণ্য প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তারেক রহমানের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এ কারণে তিনি দেশের বাইরে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এরপরও তাকে নাজেহাল করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। সর্বগ্রাসী এ সরকারের পতন ঘটলে সেদিনই তারেক রহমান দেশে ফিরবেন।

না, নেতাকর্মীদের মাঝে কোনো হতাশা আছে বলে মনে করি না। বরং তাদের মাঝে প্রতিশোধ, প্রতিরোধের চেতনা কাজ করছে। নেতাকর্মীরা আজ উজ্জীবিত, ঐক্যবদ্ধ

জাগো নিউজ : তার মানে সরকারের পতন না ঘটলে তারেক রহমান দেশে ফিরছেন না?

রুহুল কবির রিজভী : আমরা এখন শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে তারেক রহমান কখন দেশে ফিরবেন।

জাগো নিউজ : আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলছে সরকার…

রুহুল কবির রিজভী : দেশে তো আর আইনের প্রক্রিয়া চলছে না। চলছে শেখ হাসিনার প্রক্রিয়া। যে মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া হয়েছে, যে কোনো ব্যক্তি উচ্চ আদালত থেকে এমন মামলায় জামিন পান। অথচ নানা কৌশলে এবং মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। সাজা বা জামিন পাওয়া, না পাওয়ার বিষয় এখন নির্ভর করে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

জাগো নিউজ : এ পরিস্থিতির শেষ কোথায়?

রুহুল কবির রিজভী : বাঙালি জাতি স্বভাবগত কারণেই স্বাধীন এবং গণতন্ত্রমনা থাকতে চায়। আজকের যে পরিস্থিতি, কালকে তা নাও থাকতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলেই রাজনীতির উন্নয়ন ঘটবে।

জাগো নিউজ : অনেকেই মনে করছেন, রাজনীতির উন্নয়নে বিএনপিও অন্তরায়। বিএনপির জায়গায় অন্য রাজনৈতিক দল থাকলে আওয়ামী লীগ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত না। অথচ বিএনপির কারণেই জায়গা পাচ্ছে না অন্যরা…

রুহুল কবির রিজভী : সম্প্রতি খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে বিএনপিকে মাঠেই দাঁড়াতে দেয়নি সরকার। ভয়ভীতি, হামলা-মামলার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেনি। নির্বাচনের সাতদিন আগে থেকেই ধরপাকড়। নির্বাচনের দিন বেলা ১১টার পর থেকে কোনো কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের থাকতে দেয়া হয়নি।

এত প্রহসনের পরও বিএনপির প্রার্থী লক্ষাধিক ভোট পেয়েছেন। আওয়ামী লীগ ভোট লুট করেছে। অন্য রাজনীতিকও তো সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা কয় ভোট পেয়েছেন? বাম বা ডান এসে বিএনপির জায়গায় দাঁড়াক, তাদের তো বাধা দেয়া হয়নি। মানুষ তো তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। বিএনপির কাছেই আসতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : বিশ্লেষকদের ধারণা, আওয়ামীবিরোধী ভোট বিএনপি শিবিরে। বিএনপির অর্জনে এই আস্থা নয়…

রুহুল কবির রিজভী : বাকশাল হওয়ার পর খুবই শক্তিশালী রূপ দেখিয়েছিল জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)। তারা পারেনি কেন? জাসদ কিন্তু আন্দোলন করে শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটাতে পারেনি।

একটি বিষয় মনে রাখবেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনও কাজ করে না। যদিও আমরা গণআন্দোলনেই বিশ্বাস করি। বাকশাল গঠন করে শেখ মুজিবুর রহমান ফ্যাসিস্ট নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। ওই সময় জাসদ, ন্যাপ সবাই মিলে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। কিন্তু পতন ঘটেনি।

বিএনপি এখন পারছে না, ভালো কথা। তাহলে অন্যরা আসুক। আমরা স্বাগত জানাবো। বাম-ডানের অবস্থান কোথায়? তাদের কার্যক্রম কী? সব নির্যাতন তো আমাদেরই সইতে হচ্ছে। সরকারের হাজারও নির্যাতনের পর বিএনপি মাঠে রয়েছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল কি এমন নির্যাতনের মুখে পড়েছে? এরপরও আমরা লড়াই করে যাচ্ছি, এরপরও আমরা টিকে আছি।

জাগো নিউজ : এই টিকে থাকার সার্থকতা কী?

রুহুল কবির রিজভী : স্বৈরাচারের বিষবৃক্ষ চিরদিন থাকে না। উপড়ে পড়বেই। আজকের টিকে থাকাই আগামী দিনে শক্তির সঞ্চায়ন। যে অন্ধকার এসেছে, তা দূর করতে হবে আমাদেরই। এ কারণে টিকে থাকাই এখন সার্থকতা।