এক্সক্লুসিভ নিউজঃ শেখ মুজিব স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার হ​য়ে পাকিস্তান চলে যান

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার কোন ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। তাকে ঢাকায় থাকতে দু’এক সভায় দেখেছি। তাঁর বক্তৃতাও শুনেছি। তবে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব-এর রাজনীতির উপর কখনও আগে আকৃষ্ট ছিলাম না।

শেখ মুজিবকে কাছে থেকে দেখা ও তাঁর বক্তব্য ঘরােয়াভাবে শুনবার সুযােগ আমি পাই মাত্র একবার। আমাদের (অর্থাৎ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) বাংলা বিভাগের প্রফেসর ডঃ মজহারুল ইসলাম ছিলেন শেখ মুজিবের বিশেষ ভক্ত।তিনি ১৯৭০ সালে শেখ মুজিবকে একবার তাঁর বাসায় মধ্যাহ্ন ভােজনে আমন্ত্রণ জানান। তিনি এই ভােজসভায় বেশ কয়েকজন অধ্যাপককেও নিমন্ত্রণ করেছিলেন। আমি তাঁর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ভােজসভায় যােগ দিয়েছিলাম।

তবে অনেকেই সেদিন ঐ সভায় যােগ দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। অধ্যাপকদের যােগদান থেকে বিরত থাকার একটা কারণ ছিল, তদানীন্তন সরকারের বিরাগভাজন হবার ভয়।

শেখ মুজিব-এর জন্য আয়ােজিত এই ভােজসভায় যােগ দেবার পর, আমাকে অনেকে ভাবতে থাকেন আওয়ামী লীগের সমর্থক অধ্যাপক হিসেবে। আর কার্যতঃ আমি আওয়ামী লীগের কিছুটা সমর্থকও হয়ে উঠি।

আওয়ামী লীগকে তখন সমর্থন দেওয়ার ঝুঁকি ছিল অনেক। অনেকেই মনে করতেন, শেখ মুজিব হলেন মার্কিন কেন্দ্রীয় গােয়েন্দা সংস্থার লােক। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক অধ্যাপক ছিলেন বামঘেঁষা।

ছাত্র মহলেও বাম-রাজনীতি চলছিল বেশ জোরেসােরেই। দেখা যাচ্ছিল অতি বাম প্রবণতা। শেখ মুজিব মার্কিনঘেঁষা, এই ধারণা কেবল যে আমাদের দেশেই প্রচলিত ছিল, তা নয়। ভারতেও ছিল এই ধারণার একটা প্রবল বিস্তার।

এমনকি পরে শ্রীমতি গান্ধী যখন ১৯৭১ সালে আমেরিকা সফরে যান, তখন সেখানে তার এক বক্তৃতায় বলেন, শেখ মুজিব মার্কিন-বিরােধী নন। এক সময় বরং তাকে বলা হত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল।

শেখের বিজয়কে তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী বলে ভাবা উচিত হবে না (India Speaks, নামক শ্রীমতি গন্ধীর বক্তৃতা সংকলন দ্রষ্টব্য)। কথাটা আমি বলছি এই জন্য যে, অনেক শেখ মুজিবের সমালােচক পরে তাঁকে পরম সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী বলে আখ্যায়িত করেন।

আর শেখ মুজিব নিজেই দুঃখী মানুষের গণতন্ত্র গড়বার জন্য গঠন করেন বাকশাল। শেখের আগের রাজনীতি আর পরের রাজনীতিতে ফারাক ছিল অনেক। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চের আগে শেখ মুজিব Agence Frence Press-কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন: “পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কি এটা বুঝতে সক্ষম নন যে, একমাত্র আমার পক্ষেই সম্ভব পূর্ব পাকিস্তানকে কম্যুনিজম-এর হাত থেকে রক্ষা করা? যদি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তবে আমি ক্ষমতাচ্যুত হব আর আমার নামে নকশালপন্থীরা ক্ষমতা গ্রহণ করবে।

আমি যদি পশ্চিম পাকিস্তানকে খুব বেশি ছাড় দিই তবে আমি আমার কর্তৃত্ব হারাব। আমি এখন এক প্রচন্ড অসুবিধাজনক অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছি।”
শেখ মুজিবের সাক্ষাতকারের এই বিবরণ ৩১শে মার্চ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় বিখ্যাত Le Monde নামক ফরাসি দৈনিক পত্রিকায়।

আমাদের অনেকের কাছে শেখ মুজিবকে মনে হয়েছিল একজন মধ্যপন্থী (Moderate) নেতা। বাইরের বিশ্বের অনেকের কাছেও তাঁকে সে সময় মনে হয়েছিল তাই। লক্ষ্য করবার মত বিষয়, শেখ ইয়াহিয়ার সঙ্গে কখনাে কথা বলা একেবারে বন্ধ করে দিতে চাননি।

কথা তিনি চালিয়ে চলেছিলেন একটা সমাধানে আসবারই জন্য। তিনি চাচ্ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন (Autonomy)। সাবেক পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দেবার কথা তিনি তখনও ভাবছিলেন না।

অথবা তা সম্ভব বলে তাঁর মনে হচ্ছিল না। শেখ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার মত ভারতে না গিয়ে ধরা দিয়েছিলেন পাকবাহিনীর হাতে। অথবা ধরা দেবার অভিনয় করে চলে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে।
বিষয়টি আজও হয়ে আছে রহস্যময়। তাঁকে নিয়ে এখন অনেক বই লেখা হয়েছে। কিন্তু কেউ-ই এ বিষয়ে যথেষ্ট আলােকপাত করতে সক্ষম হননি। পাক-কারাগার থেকে মুক্ত হবার পর, শেখ মুজিব ভারতে অথবা বাংলাদেশে না এসে, পাক-বিমানে যান বিলাতে।

পরে তিনি ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমানে করে আসেন বাংলাদেশে। তিনি নাকি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি, বাংলাদেশে পাকসেনার পতন ঘটেছে! সব বিষয়টিকে তিনি ভাল করে জানবার ও বুঝবার জন্যই পাকিস্তান থেকে করেন বিলাত যাত্রা।

শেখ মুজিব-এর অনেক সিদ্ধান্তই তার সাধারণ সমর্থকদের হতবাক করে। শেখ মুজিব ক্ষমতা পেয়েই তাঁর এককালের ঘনিষ্ঠ সহযােগী তাজউদ্দীনকে অপছন্দ করতে থাকেন। অবশেষে তাকে করেন সর্ব প্রকার ক্ষমতার আসন থেকে বঞ্চিত।

অনেককে বলতে শুনেছি, শেখ মুজিব তাজউদ্দীন-এর অতি ভারত ঘেঁষা নীতিকে মানতে পারেননি বলেই তাঁকে সরিয়ে দেন মন্ত্রিসভা থেকে। কিন্তু তিনি নিজেও কি ভারতের সাহায্য কামনা করেননি, ক্ষমতায় টিকে থাকবার জন্য!

একজন ভারতীয় গ্রন্থকারের মতে, শেখ মুজিব ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশ ছাড়তে বললেও গােপনে ইন্দিরাগান্ধীকে অনুরােধ করেছিলেন বাংলাদেশে অন্ততঃ এক ব্রিগেড ভারতীয় সৈন্য রাখতে। কিন্তু জেনারেল ওসমানী এর বিরােধিতা করেন।

আর এর ফলে শেখ মুজিব তাঁকেও করেন ক্ষমতাচ্যুত (দ্রষ্টব্য, Dateline Mujibnagar : Arun Bhattacharjee. P. 195. vikas Publishing House, New Delhi. ১৯৭৩)। আসলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারত সরকারের একটা যােগসূত্র অনেক দিন আগে থেকেই গড়ে উঠতে আরম্ভ করেছিল।

উক্ত লেখকের মতে, হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। গড়ে ওঠে দীর্ঘদিন ধরে। আওয়ামী লীগের নেতাদের যােগাযোেগ আরম্ভ হয় ১৯৫২ সাল থেকে। এ-সময় যােগাযােগ ঘটে মৌলানা ভাসানীর সঙ্গে।

সে সময় পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের হাই কিমশনার সি.সি দেশাই( C C Desai) ভাসানীর সঙ্গে সুকৌশলে দেখা করেন টাঙ্গাইলে, রনদা প্রসাদ সাহার স্থাপিত মেয়েদের স্কুলের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। তিনি ভাসানীকে আভাস দেন, পূর্ব পাকিস্তান যদি বিদ্রোহ করে, তবে ভারত সরকার তার পক্ষে দাঁড়াবে।

এ-সব কথা শেখ মুজিবের অজানা থাকবার কথা নয়। কিন্তু তবুও তিনি যাবার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেছিলেন পাকিস্তানে। আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতার মত ভারতে তিনি যাননি। সম্ভবত, তিনি ভারতের আশ্বাস বাণীর উপর কোন বিশেষ কারণে আস্থা আনতে অক্ষম হয়েছিলেন।

মনে হয়, হয়ত আগামী ইতিহাস লেখকদের জন্যে ঘটনাটির ব্যাখ্যা জটিল মনে হবে। আমার মনে হয়, শেখ হয়ত ভেবেছিলেন, আপাততঃ পাকিস্তান যাই। তাজউদ্দীনরা যদি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারে, ভাল। নইলে পাকিস্তানে দরকষাকষি করে একটা ভিন্নধরনের আপােষ রফায় আসা যেতে পারবে। দুই পথই খােলা রাখতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব।

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হল বাকশাল গঠন। এদেশের মস্কোপন্থী কম্যুনিস্টরা তাঁকে বােঝাতে পারে, বাকশাল গঠনের ফলে তার পক্ষে ফিদেল কাসত্রোর মত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সম্ভব হবে।

সম্ভব হবে সােভিয়েত রাশিয়ার সাহায্য ও সহযােগিতা পাওয়া। যেমন পাচ্ছে কাসত্রোর কিউবা। কিন্তু বাকশাল গঠন করবার ফলে শেখ মুজিব হারালেন এদেশের মানুষের আস্থা। অন্যদিকে হন তার পুরাতন মিত্র আমেরিকার বিরাগভাজন।

সেটা ছিল বিশেষ ভাবেই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। দেশবাসীর অনাস্থা ও আমেরিকার উন্মা, ডেকে আনে তার রাজনীতি ও ব্যক্তিগত জীবনের করুণ পরিণতি।

অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, এক সময় আওয়ামী লীগকে সমর্থন করলেও এখন আর সমর্থন করি না কেন? এক কথায় এর উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, মতে মেলে না বলে।

আমি শেখ মুজিবকে সমর্থন করেছিলাম দেশে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থাপনের আশায়। কিন্তু শেখ গঠন করেন বাকশাল। যা আমাদের মত মূল্যবোেধসম্পন্ন মানুষের পক্ষে কখনও সমর্থন করা সম্ভবই নয়।

১৯৭১ সালে অনেকের মত আমিও ভারতে যাই। ভারতে যেয়ে আমার মূল চিন্তাধারায় বেশ পরিবর্তন ঘটে। আমি ভারতে যেয়ে লক্ষ্য করি, ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল, প্রচার করে চলেছে, বাংলাদেশের ঘটনাবলী জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two Nations Theory) মিথ্যা প্রমাণ করতে চলেছে।

আমি লক্ষ্য করি, এর মাধ্যমে ভারতীয় জনসাধারণকে বােঝাবার চেষ্টা চলেছে, আপাতত বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে বটে, কিন্তু ভবিষ্যতে তা আসলে হয়ে দাঁড়াবে ভারতেরই অংশ। কারণ, আজকের বাংলাদেশের সীমান্ত রচিত হয়েছে দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তি না থাকলে ঐ সীমান্ত রেখারও কোন কার্যকারিতা আর থাকবে না। তাই সর্বশক্তি দিয়ে সমর্থন কর স্বাধীন বাংলাদেশ গড়বার দাবীকে। চারিদিকে প্রচার চালাও তার জন্যে। বল, নজরুল আর জীবনান্দ দাসের বাংলাদেশের কথা। আমি বুঝতে পারি, এই ধরনের প্রচারণার বিপদজনক পরিণতির কথা॥

আমারদেশ

সবাইকে জানিয়ে দিতে নিউজটি অবশ্যই শেয়ার করুন