জাতীয় ঐক্য, গোয়েবলসের কিবোর্ড এবং এনেইবলার-শিবলী সোহায়েল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছুদিন ধরেই একটি জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। আমি শুধু ভাবছি, যেখানে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’–এর কোরাস আর ‘এনেইবলার’দের হুক্কাহুয়া যথেষ্ট সক্রিয় সেখানে কি আদতেই জোরালো কোন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারবে? রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ, গুম, হত্যা এসবের কথা এই আলোচনাতে আনছি না। কারণ আমি মনে করি ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’ ছাড়া শুধুমাত্র গুম-হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে এত এত ব্যাংক লুট, সোনা লুট, কয়লা লুট, ভোট লুট করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ফ্যাসিবাদের এই দুই অস্ত্র, ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আজকের লেখায় এই দুটি বিষয়কেই মূলত তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
আশার কথা হচ্ছে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’দের প্রবল কার্যকারিতা থাকা স্বত্বেও সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলনে এবং বিশেষ করে স্কুল শিশুদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এতটাই বেশী ছিল যে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’ এ দুইয়ের সমন্বিত দুষ্টচক্রটি এক্ষেত্রে হালে তেমন পানি পাননি। এই দু’টি আন্দোলন আমাদেরকে যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য হলে হবেনা, বরং সমস্ত জনগণকেই একসাথে মাঠে নামতে হবে। মনে হচ্ছে এছাড়া এই গুম-খুন চালিয়ে যাওয়া লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আর অন্য কোন উপায় নেই।
জানতে পারলাম ড. কামাল হোসেন তাঁর জীবনের শেষ কাজ হিসেবে এই জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় পা বাড়িয়েছেন। সাথে এগিয়ে এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী। শোনা যাচ্ছে যোগ দিতে পারে বিএনপি’র নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট এবং আরো অনেকেই। ড. ইউনুসও না কি যোগ দিতে পারেন। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আহুত সমাবেশ থেকে এ জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দেওয়া হবে। তবে এই জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা পুলিশের গ্রেফতার, গুলি বা গুম-খুন নয়। সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’।
পাঠকরা অনেকেই হয়তো জানেন তবুও আজকের এ লিখায় ফ্যাসিবাদের এই দুটো প্রধান অস্ত্র সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত বলার চেষ্টা করবো। কিন্তু তার আগে জাতীয় ঐক্যের স্বরূপ নিয়ে দুটো কথা বলে নেওয়া দরকার। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য সবাইকে এক ব্যানারে আসতে হবে, সবাইকে একই স্লোগান দিতে হবে, সবাইকে একই আদর্শ বা মতের হতে হবে তা কিন্তু রাজনীতি শাস্ত্রের কথা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও এমন আজগুবি কিছু দেখা যায় না। তবে সবার লক্ষ্য এক হতে হবে। রাজনীতিতে ঐক্য কিংবা জোটের মর্মার্থ হলো এটিই।
বৃটিশ বিরোধী আন্দলোনের কথাই ধরুন। তখন একদিক থেকে স্লোগান উঠত, “নারায়ে তাকবির” আবার অন্যদিক থেকে শোনা যেত, “বন্দে মাতারম”। এরা সবাই কিন্তু এক ব্যানারে আন্দোলন করেনি, সেটা সম্ভবও ছিলোনা। কিন্তু সবার লক্ষ্য ছিল ‘বৃটিশ খেদাও’। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যকান্ডের কথা আমরা সবাই জানি। সেদিন অসংখ্য শিখ ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ এবং শিশুরা একত্রিত হয়েছিল অমৃতসরে ডা. সাইফুদ্দিন কিচলুকে গুম করার প্রতিবাদে। এই প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা অকাতরে জীবনও দিয়েছিল। নাম শুনেই বুঝতেই পারছেন ডা.সাইফুদ্দিন কিচলু কোন শিখ ধর্মাবলম্বী নেতা ছিলেন না। কিন্তু তাদের সবার ধর্ম, বর্ণ, স্লোগান, ব্যানার আলাদা থাকলেও লক্ষ্য ছিল এক। তারা জানত আজ কিচলু গুম হয়েছে, কাল তাদের একজনকে করা হবে।
এমন উদাহারণ আরও অনেক টানা যাবে। যেমন ১৯৫২ সালে ধর্মপ্রান তমুদ্দুন মজলিসের ভাষা আন্দোলনের ডাকে বামপন্থীরাও যোগ দিয়েছিল। তাদেরকে ব্যানার পরিবর্তন করতে হয়নি, আদর্শ ত্যাগ করতে হয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং ১৯৫৪, ৬৯ বা ৯০ এর গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের দিকে তাকালেও একই দৃশ্য আমরা দেখতে পাই। ব্যানার ছিল ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক।
মজার বিষয় হচ্ছে, ভিন্নতা স্বত্বেও একই লক্ষ্য নিয়ে সবাই যখন মাঠে নামে, শোষক শ্রেণী তখন ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ কে নির্দেশ দেয় বিভক্তির সুর বাজাতে। আর কিবোর্ডের ‘কি’ গুলো একই সুরে বার বার বলতে থাকে, “তুমি অমুকের সাথে কেন?” অমুক তো যবন, তমুক তো কাফের, অমুক রাজাকার, তমুক নাস্তিক। কিবোর্ডের এই ‘কি’ গুলো সুরের মুর্ছনায় বিভিন্ন ট্যাগ ব্যবহার করে বিভক্তি এবং বিদ্বেষের সৃষ্টি করে মূলত জনগণের আন্দোলনকে দমন করে দিতে চায়। আর এর সাথে তাল মিলিয়ে এক বিশেষ ধরনের ‘এনেইবলার’দেরকে বলতে দেখা যায়, “তুমি অমুকের সাথে থাকলে আমি কিন্তু নাই”। এনেইবলারদের অনেকগুলো প্রকারভেদ আছে, ধরন আছে – সে কথায় একটু পরেই আসছি। প্রথমে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ সম্পর্কে একটু জেনে নিই।
‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’
ফ্যাসিস্টদের ধর্মগুরু হচ্ছে পল জোসেফ গোয়েবলস। ফ্যাসিবাদকে সফলভাবে চালু রাখতে ফ্যাসিস্টদের জন্য তার অসংখ্য স্বর্গীয় বানীর একটি হচ্ছে, “Think of the press as a great keyboard on which the government can play”
এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, সংবাদ মাধ্যমকে নিজের কী বোর্ড বানাও,যেমন খুশি তেমন সুর বাজাও।
ফ্যাসিস্টদের জন্য সংবাদ মাধ্যম সংক্রান্ত তার আরেকটি স্বর্গীয় বানী হল, “Give me the media and I will make of any nation a herd of swine”
অর্থাৎ- “আমাকে গণমাধ্যম দাও, আমি যেকোন জাতিকে শুয়োরের পাল বানিয়ে দেব”।
গোয়েবলসের স্বর্গীয় বাণী অনুসরণ করে দেশের প্রায় সমস্ত গণমাধ্যমকে কিবোর্ডের “কি” বানিয়ে ইতিমধ্যেই নিজেদের আঙুলের তলায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং যখন যে সুর প্রয়োজন তা বাজানো হচ্ছে। গণমাধ্যমগুলো এখন জনগণের কথা না বলে ভারতের হাতি আটকে যাওয়া নিয়ে ভীষন ব্যাস্ত থাকে।
প্রশ্ন আসতে পারে এটা কিভাবে সম্ভব হল। এ বিষয়ে আরেক স্বৈরাচার মিসরের বর্তমান শাসক আল-সিসির একটি কথা মনে পড়ে গেল। ক্ষমতা দখলের পরপরই মিডিয়াকে কিবোর্ড বানানোর ব্যাপারে আল-সিসি তার সাঙ্গপাঙ্গদেরকে বলেছিলেন, যাদের টাকা দিয়ে কেনা যায় এবং যাদেরকে ভয় দেখিয়ে বসে রাখা যায় তাদেরকে নিয়ে আমি চিন্তিত না। কিন্তু যাদেরকে কেনাও যায় না, ভয়ও দেখানো যায় না তাদেরকে নিয়ে কি করার? দেখা যাচ্ছে এই বিষয়ে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠি বেশ কয়েকধাপ এগিয়ে আছে। যাদেরকে কেনা যায় না, ভয় দেখানো যায় না, যেমন মাহমুদুর রহমান, শফিক রেহমান, আবুল আসাদ, শওকত মাহমুদ, সাগর–রুনি, এদের উপর হয় ষ্টীম রোলার চলছে নয় তো সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যখন যেখানে যেমন প্রয়োজন তখন ঠিক সেভাবে গোয়েবলসের কিবোর্ড- গণমাধ্যমগুলোকে বাজিয়ে গোয়েবলসের ধর্মানুসারে আমাদের জাতীর একটি অংশকে শুয়োরের পাল বানিয়ে রাখা হয়েছে আর যারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই শুয়োরের পাল থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে তাদেরকে বিভক্ত করতে বাজানো হচ্ছে আরেক সুর। যেমন, ২০১৪ সালের ৬ই জানুয়ারি বিবিসি বাংলা খালেদা জিয়ার একটি সাক্ষাৎকার নেয়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পরদিন মূল প্রসঙ্গ কি হওয়ার কথা তা যে কোন সচেতন মানুষই বোঝে। কিন্তু মূল বিষয় থেকে সরে এসে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে প্রশ্ন করা হল তার জোট সম্পর্কে এবং জামায়াতের সঙ্গ ছাড়া নিয়ে। তবে এ বিষয়ে খালেদা জিয়া স্পষ্ট ভাষায় সেদিনবলেছিলেন, “বিএনপি তাদের রাজনীতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কারো দ্বারা নির্দেশিত হবে না”। এখানে একটা বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে বিবিসি বাংলার ভূমিকা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই যেকোন ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশের মানুষ বিবিসি বাংলাকে জনগনের পাশে পেয়েছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় আতাউস সামাদের কন্ঠ ও তার ভূমিকার কথা সবারই মনে থাকার কথা। তবে বিস্ময়করভাবে ইদানিং বিবিসি বাংলার ভূমিকা আর প্রশ্নের উর্ধে নয়।
আরও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আন্তর্জাতিক অন্যান্য গণমাধ্যমগুলো যখন বাংলাদেশের গুম-খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলছে তখন স্বদেশী গণমাধ্যমগুলো গোয়বলসের কিবোর্ডের ভুমিকায় ফ্যাসিজমের তালে তালে সুর বাজিয়ে চলেছে। বিভিন্ন টক শোতে দেখা যাচ্ছে তারা বিএনপির নেতা নেতৃদেরকে এই জোট নিয়েই বার বার প্রশ্ন করে যাচ্ছে। অবাক ব্যাপার হচ্ছে এরা কেউ কিন্তু আওয়ামীলীগের সাথে গণবাহিনীর নেতাদের জোট নিয়ে কোন প্রশ্ন করছে না। এদের প্রশ্ন সব বিরোধী জোট নিয়ে এবং বিশেষভাবে বিএনপি-জামাত জোট নিয়ে।কিছুদিন আগে ৭১ টিভিতে এরকম একটি টক শোতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে এই একই প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, জামাতের সাথে বিএনপি জোট যদি জনগণ পছন্দ না করে তাহলে ক্ষতি হলে বিএনপির হবে, আল্লার ওয়াস্তে জনগণকে তো তাদের মতামতটা দিতে দিন।
এ নিয়ে বিএনপি বার বারই বলে আসছে জামাতের সাথে তাদের এই জোট কোন আদর্শিক জোট নয়, এটা মুলতঃ নির্বাচনী জোট। তারপরও কিবোর্ডের সুর থামছে না। এই সুর না থামার কারন হচ্ছে ভোটের হিসাব নিকাশ। ৯১, ৯৬ এবং ২০০১ এর নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আওয়ামীলীগের পক্ষে এই জোটের সামনে কোন নিরেপেক্ষ নির্বাচনে দাড়ান সম্ভব নয়। তবে আওয়ামীলীগের জনপ্রিয়তা এখন যে তলানিতে তাতে করে আমার মনে হয় না কোন জোটের প্রয়োজন আছে, যে কোন কলা গাছ দাড়ালেও নিশ্চিন্তে জিতে যাবে। তবে একটি নিরেপেক্ষ নির্বাচনে দিতে এই অবৈধ সরকারকে বাধ্য করার জন্য জোটের প্রয়োজন আছে।
বর্তমানে যে জাতীয় ঐক্যের আলাপ হচ্ছে সেখানেও গোয়েবলসের কিবোর্ডের ব্যবহার আবারও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গণমাধ্যমগুলোতে সেই একই প্রশ্ন বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। গোয়েবলসের ধর্মানুসারে ফ্যাসিস্ট সরকারের দিক নির্দেশনাতেই তা হচ্ছে বলে মনে হয়।
বলে রাখা ভালো, সেই সময় গোয়েবলসের একটা বড়শত্রু ছিল বিদেশী রেডিওর সংবাদ। আর এখন বাংলাদেশের ফ্যাসিস্টের সবচেয়ে বড় শত্রু হল স্যোশাল মিডিয়া। তাই গোয়েবলসের কিবোর্ডের বিরুদ্ধে জনগণকে এই স্যোশাল মিডিয়া নিয়েই আরও শক্তভাবে দাড়াতে হবে।

এনেইবলার:
এনেইবলার (Enabler) হলো যারা কোন অন্যায়কে বৈধতা দেয় অথবা তাকে স্বাভাবিক বলে প্রচার করে এবং পরোক্ষভাবে অন্যায়কে ও অন্যায়কারীকে সহায়তা করা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে এরা বিভিন্নভাবে থামিয়ে দেয় বা নিরস্ত্র করে। কয়েকটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা বুঝতে হয়তো আরও সুবিধা হবে। যেমন, দেশে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। শিক্ষা ব্যাবস্থার জন্য এটা একটা বিশাল হুমকি। এই অন্যায়ের সাথে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার বিষয়টিও প্রকাশ হয়ে গেছে। কিন্তু এনেইবলাররা বলছে, “আরে এরকম প্রশ্ন ফাঁস তো সবসময়ই হয়” অথবা “এই ডিজিটাল যুগে একটু আধটু অমন হতেই পারে”। এদেরকে আবার প্রশ্ন ফাসের জন্য অভিভাবকদের দোষারোপ করতেও দেখা যায়। আবার ধরুন দেশে গুম খুন হচ্ছে, তখন এরা বলছে, আরে গুম-খুন তো সবদেশেই হয়।
এনেইবলারের আরেকটি বড় উদাহরণ দেখতে পেলাম এই কিছুদিন আগে। স্কুল শিশুদের উপর যখন ছাত্রলীগ হামলে পড়ল, মুহম্মদ জাফর ইকবাল “আমরা জানতে চাই” শিরোনামে গত ১০ই আগস্ট একটি কলাম লিখলেন। এই লিখায় তিনি উল্লেখ করলেন, “স্কুলের বাচ্চা ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা মারামারি করেনি। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে কেন বড়রা মারামারি করতে এসেছে? তারা কারা? এক পক্ষ ছাত্রলীগ, সরকার সমর্থক কিংবা পুলিশ হতে পারে, অন্যপক্ষ কারা? আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনিও উত্তর দিতে পারেননি”।
খেয়াল করে দেখুন তিনি বাচ্চা ছেলেমেয়েদেরকে দোষ দিতে পারছেন না ঠিকই কিন্তু তাদের পেছনে কারা ছিল বলে পুরো বিষয়টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসকে, পুলিশ এবং সরকারের অন্যায়কে আড়াল করতে সাহায্য করছেন। কিন্তু যে কোন সাধারণ মানুষ বলবে যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আক্রান্ত হলে তাদেরকে রক্ষায় তাদের অভিভাবকরা, আশেপাশের লোকজন এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। সত্যি ঘটনা হচ্ছে সেদিন স্কুল ছাত্রছাত্রীদের রক্ষায় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পুরোদমেই নেমেছিল এবং তা জাফর ইকবালেরও জানা না থাকার কথা নয়। খেয়াল করে দেখুন উনি কিন্তু একবারও জানতে চাননি হেলমেটধারী ওরা কারা যারা পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রদের উপর আক্রমণ করছিল। এটা একটা এনেইবলারের কাজের স্পষ্ট উদাহরন।
একটি দেশে অন্যায় অনাচারের বিস্তার এবং তা চলতে থাকার জন্য অন্যায়কারীদের চাইতেও এনেইবলারদের ভূমিকা অনেক বেশি। আর এনেইবলার ছাড়া কোন স্বৈরাচার, কোন ফ্যাসিস্ট বেশিদিন টিকতে পারেনা। ফ্যাসিস্টরা তাদের প্রয়োজনেই এ ধরণের এনেইবলারদের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে এই এনেইবলার তৈরীর কাজ এরা শুরু করেছিল বিরাশি / তিরাশি সালের দিক থেকে। আজ তাদের ক্ষমতার চারপাশে নানা প্রকারের এনেইবলার দেখা যাচ্ছে। এনেইবলারের প্রকারভেদও আছে অনেক রকম। যেমন, Scared Enablers, Cynical Enablers, Denial Enablers, Compromised Enablers, Egotistical Enablers ইত্যাদি আরও নানা প্রকার রয়েছে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আজকের মূল প্রসঙ্গ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়টি দেখতে গিয়ে কেন আমাদেরকে এনেইবলার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে সেদিকে নজর দেব।
এতক্ষণে আমরা এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছি যে এই এনেইবলারদের কাজই হচ্ছে অন্যায়কারীকে যে কোন মুল্যে রক্ষা করা। আর তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেকোন আন্দোলনকে রুখতে ফ্যাসিস্ট সরকার প্রথমেই এই এনেইবলারদেরকে ব্যবহার করে এবং আগামীতেও তাই করবে। একেবারে প্রাথমিক স্তরের এক ধরণের এনেইবলারদেরকে বলতে দেখা যায়, “আরে সবাই খারাপ, সব রাজনীতিবিদরা খারাপ”। এরা সবসময় একটু নিরেপেক্ষ নিরেপেক্ষ ভাব ধরে। সবাই খারাপ বলার মাধ্যমে এরা মূলত অন্যায়কারীদেরকে অন্য সবার সাথে মিলিয়ে পরোক্ষভাবে তাদেরকেই রক্ষা করতে চেষ্টা করে। এরা আরও প্রশ্ন তুলে, “বুঝলাম আওয়ামীলীগ খারাপ, কিন্তু যে আসবে সে কি ভাল কোন কিছু করবে? সে হয়তো এর চাইতেও খারাপ করবে”। এই প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে একদল মানুষকে তারা আন্দোলনে যোগ দেওয়া থেকে নিরস্ত্র করতে চেষ্টা করে এবং সামনে আরও জোরাল ভাবে করার সম্ভাবনা আছে।
এরপর আরেক ধরনের এনেইবলার, তারা চেষ্টা করে আওয়ামীলীগের অন্যায়ের দিক থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রেখে বিরোধী দলের দোষ ধরায় মানুষকে ব্যস্ত রাখতে। এই কাজ তারা অনেক আগে থেকেই করে আসছে এবং এখন আরও বেশী পরিমানে করার সম্ভাবনা। এরা সাধারণত অত্যাচারিত মানুষের প্রতি প্রচন্ড সহমর্মিতার ভাব দেখায়। যেমন, মানুষ যদি রাস্তায় নেমে মার খায় তাহলে এরা বলে, “আহ হা হা, চুকচুক চুক ওরা রাস্তায় নামতে গেল কেন”? কিন্তু যারা মারল তাদেরকে এরা দোষ দেবেনা। এরা ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর বলেছিল, “বিএনপি-জামাত নির্বাচনে গেল কেন”? আবার ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর এরাই মন্তব্য করে আসছে, “নির্বাচনে না যাওয়াটা চরম ভুল ছিল”।
খেয়াল করে দেখুন এরা আওয়ামীলীগ যে নির্বাচন নিয়ে কতবড় জালিয়াতি করল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে বাংলাদেশের গনতন্ত্রের গলা টিপে দিল সেটা কিন্তু সম্পুর্ন চেপে যাচ্ছে। এদেরকেই আবার ঘন ঘন বলতে শোনা যায়, “আওয়ামীলীগের সাথে পেরে উঠার মত বিএনপির যোগ্য কোন নেতা নেই, এরা রাস্তায় নামতে পারেনা আন্দোলন কি করবে, জামাতের সাথে থেকে এরা সবচেয়ে ভুল করেছে” ইত্যাদি। এখানে দেখুন এরা কিন্তু আন্দোলনকারী মানুষের চোখ উপড়ে ফেলে, হাত পায়ের নখ তুলে ফেলে হত্যা করার মত আওয়ামী নির্যাতনের কথা বেমালুম এড়িয়ে গিয়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যের ঘাড়ে। এরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করে আসলে আন্দোলন করে কোন লাভ নেই।
আরেকটু উপরের স্তরের এনেইবলাররা সরাসরি জাতীয় ঐক্যে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য কাজ করে। এরা আওয়ামী বিরোধী ভাব ধরলেও মূলত ওদের হয়েই কাজ করে। এরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবনা ও শর্ত আরোপের মাধ্যমে এ বিভক্তি ঘটানোর চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়াটি এখন জাতীয় ঐক্য গড়ার আলচনায় বেশ ভালভাবেই চলছে। ড. কামালের প্রস্তাবনা এবং মাহি বি চৌধুরির শর্ত এই পর্যায়ে পড়ে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলেও এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
আরও উপরের স্তরের এনেইবলাররা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার, ফাঁসি, গুম, খুন ইত্যাদিকে সরাসরি বৈধতা (legitimacy) দিতে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াও চলছে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আর এখন শুরু হয়েছে খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়ার মাধ্যমে। একুশে আগষ্টের গ্রেনেড হামলার বিষয়টিও এসময় তুলে আনা হয়ছে সেই একই কারণে।
এই এনেইবলারদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে, তাদেরকে চিহ্নিত করে, সামাজিক ভাবে এদেরকে বয়কট করেই জনগণকে সামনের দিকে এগোতে হবে। মনে রাখতে হবে এই এনেইবলারাই দেশের মেরুদন্ড সম্পন্ন, দেশপ্রেমী নেতাদের বিচারিক হত্যাকাণ্ড, গুম, গ্রেফতার এবং নির্যাতনকে বৈধতা দিয়ে আসছে বহুদিন ধরে এবং সামনেও তাই করবে।
একদম সম্প্রতি জানা গেলো, খালেদা জিয়া জেল থেকে বলিষ্ঠ ভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন ২০ দলীয় জোটের ঐক্য ধরে রাখবার জন্য। তিনি নাকি জাতীয় ঐক্যের চেয়ে দল ও ২০ দলীয় জোটের ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। এতে করে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এনেইবলাররা একটা ছোট খাট চড় খেয়েছেন। তবে পুরো ব্যাপারটা কোন দিকে যায় সেটা দেখতে আমাদেরকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
(লেখক: লেকচারার, চার্লস ষ্টার্ট ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া)